সংবাদ শিরোনামঃ

নিজ হাতে নিজের কবর বানিয়ে চিরবিদায় নিলেন তোতা মাস্টার!

মীর মোঃ মনির হোসেন, নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৮:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নিজ হাতে নিজের কবর বানিয়ে চিরবিদায় নিলেন তোতা মাস্টার!

মীর মোঃ মনির হোসেন, নিজস্ব প্রতিনিধি

 

জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়েছেন সততা, আত্মমর্যাদা আর মানুষের জন্য কাজ করে। শিক্ষকতা করেছেন, আইন পেশায় থেকেছেন, গড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। মৃত্যুর আগেই পরকালের প্রস্তুতি হিসেবে বাড়ির উঠানেই নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন নিজের কবর। সেই মানুষটিই অ্যাডভোকেট মো. জহুরুল ইসলাম মণ্ডল—যিনি এলাকাজুড়ে পরিচিত ছিলেন “তোতা মাস্টার” ও পরে “তোতা উকিল” নামে।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দক্ষিণ জামুডাঙ্গা গ্রামের এই মানুষটির মৃত্যু হয়েছে গত ৬ মে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে। দীর্ঘদিন ধরে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।

১৯৪৫ সালের ৬ জুন জন্ম নেওয়া জহুরুল ইসলাম মণ্ডলের জীবন ছিল সংগ্রাম, শিক্ষা, নীতি ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ছোটবেলায় পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়ে এলাকায় “তোতা মাস্টার” নামে পরিচিতি পান। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন নিয়াতনগর উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে জামুডাঙ্গা আদর্শ দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসা। ১৯৯৩ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে হয়ে ওঠেন “তোতা উকিল”।

গাইবান্ধা আদালতের সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে সততা, স্পষ্টভাষিতা ও ন্যায়বোধের জন্য সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন তিনি।

এলাকাবাসী জানান, অত্যন্ত ধর্মভীরু ও পরকাল সচেতন ছিলেন জহুরুল ইসলাম মণ্ডল। ২০২০ সালের শেষদিকে বাড়ির উঠানের পশ্চিম পাশে নিজেই নিজের কবর প্রস্তুত করেন।

তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন স্ত্রীও তাঁর পাশেই শায়িত হতে পারেন। সে কারণে পাশাপাশি দুটি কবরের স্থান পাকা করে রেখেছিলেন তিনি।

তাঁর ছেলে সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ মন্ডল বলেন, “বাবা সবসময় মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত আর মানুষের উপকার করাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ মনে করতেন। নিজের কবর নিজে তৈরি করার ঘটনাটিও ছিল তাঁর পরকাল ভাবনারই অংশ।”

  1. তিনি আরও বলেন, “বাবা কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। মানুষের কষ্ট দেখলে নিজে এগিয়ে যেতেন। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু আদর্শে অসাধারণ।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি চলাফেরায় দুর্বল হয়ে পড়েন। তবুও সুযোগ পেলেই আদালতে যেতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন তিনি।

গত ৫ মে রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে চিকিৎসকরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাদ আসর নিজ গ্রামে জানাজা শেষে বাড়ির উঠানেই, নিজের তৈরি করা সেই কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁকে।
স্থানীয়রা বলছেন, জহুরুল ইসলাম মণ্ডল শুধু একজন শিক্ষক বা আইনজীবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের আস্থা, সাহস ও নৈতিকতার প্রতীক। তাঁর মৃত্যুতে সাদুল্লাপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

নিজ হাতে নিজের কবর বানিয়ে চিরবিদায় নিলেন তোতা মাস্টার!

আপডেট সময় : ০৪:৫৮:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

নিজ হাতে নিজের কবর বানিয়ে চিরবিদায় নিলেন তোতা মাস্টার!

মীর মোঃ মনির হোসেন, নিজস্ব প্রতিনিধি

 

জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়েছেন সততা, আত্মমর্যাদা আর মানুষের জন্য কাজ করে। শিক্ষকতা করেছেন, আইন পেশায় থেকেছেন, গড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। মৃত্যুর আগেই পরকালের প্রস্তুতি হিসেবে বাড়ির উঠানেই নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন নিজের কবর। সেই মানুষটিই অ্যাডভোকেট মো. জহুরুল ইসলাম মণ্ডল—যিনি এলাকাজুড়ে পরিচিত ছিলেন “তোতা মাস্টার” ও পরে “তোতা উকিল” নামে।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দক্ষিণ জামুডাঙ্গা গ্রামের এই মানুষটির মৃত্যু হয়েছে গত ৬ মে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে। দীর্ঘদিন ধরে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।

১৯৪৫ সালের ৬ জুন জন্ম নেওয়া জহুরুল ইসলাম মণ্ডলের জীবন ছিল সংগ্রাম, শিক্ষা, নীতি ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ছোটবেলায় পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়ে এলাকায় “তোতা মাস্টার” নামে পরিচিতি পান। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন নিয়াতনগর উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে জামুডাঙ্গা আদর্শ দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসা। ১৯৯৩ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে হয়ে ওঠেন “তোতা উকিল”।

গাইবান্ধা আদালতের সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে সততা, স্পষ্টভাষিতা ও ন্যায়বোধের জন্য সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন তিনি।

এলাকাবাসী জানান, অত্যন্ত ধর্মভীরু ও পরকাল সচেতন ছিলেন জহুরুল ইসলাম মণ্ডল। ২০২০ সালের শেষদিকে বাড়ির উঠানের পশ্চিম পাশে নিজেই নিজের কবর প্রস্তুত করেন।

তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন স্ত্রীও তাঁর পাশেই শায়িত হতে পারেন। সে কারণে পাশাপাশি দুটি কবরের স্থান পাকা করে রেখেছিলেন তিনি।

তাঁর ছেলে সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ মন্ডল বলেন, “বাবা সবসময় মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত আর মানুষের উপকার করাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ মনে করতেন। নিজের কবর নিজে তৈরি করার ঘটনাটিও ছিল তাঁর পরকাল ভাবনারই অংশ।”

  1. তিনি আরও বলেন, “বাবা কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। মানুষের কষ্ট দেখলে নিজে এগিয়ে যেতেন। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু আদর্শে অসাধারণ।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি চলাফেরায় দুর্বল হয়ে পড়েন। তবুও সুযোগ পেলেই আদালতে যেতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন তিনি।

গত ৫ মে রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে চিকিৎসকরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাদ আসর নিজ গ্রামে জানাজা শেষে বাড়ির উঠানেই, নিজের তৈরি করা সেই কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁকে।
স্থানীয়রা বলছেন, জহুরুল ইসলাম মণ্ডল শুধু একজন শিক্ষক বা আইনজীবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের আস্থা, সাহস ও নৈতিকতার প্রতীক। তাঁর মৃত্যুতে সাদুল্লাপুরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।